এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম, লক্ষণ, কারণ, ঘরোয়া চিকিৎসা ও প্রতিকার
এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম বা মলম, এই রোগের লক্ষণ, কারণ, এনাল ফিশারের ঘরোয়া
চিকিৎসা ও প্রতিকার সার্জারির মাধ্যমে এই রোগ বা এই সমস্যা সম্পূর্ণ নিরাময় করা
যায় কিনা। এই সমস্যা সমাধানের কোন হোমিওপ্যাথি ঔষধ আছে কিনা।
অথবা এনাল ফিশার থেকে মুক্তির উপায় এই সম্পর্কে এই পোস্টের মাধ্যমে বিস্তারিত
আলোচনা করতে চলেছি। চলুন তাহলে এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম সম্পর্কে আপনাদের
সামনে সম্পূর্ণ তথ্য বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
এনাল ফিশার কি
এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আগে আমাদের যে জিনিসটা জানা
সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হল এনাল ফিসার কি? এনাল ফিশার হলো মলদ্বারের
ভেতরের চামড়ায় হওয়া ছোট ফাটা বা ক্ষত। সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে, পায়খানা
বের হওয়ার পথে চামড়া ছিঁড়ে গেলে যেটা হয় সেটাই এনাল ফিশার। এটি খুবই সাধারণ
একটি সমস্যা এবং যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। এনাল ফিশার হওয়ার প্রধান
কারণ হলো শক্ত বা শুকনো পায়খানা। দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে পায়খানার সময়
অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং এতে মলদ্বারের চামড়া ফেটে যায়।
এছাড়া ঘন ঘন ডায়রিয়া, প্রসবের সময় জোর দেওয়া, বা পায়ুপথে আঘাত লাগলেও
এই সমস্যা হতে পারে। এনাল ফিশারের প্রধান লক্ষণ হলো পায়খানার সময় তীব্র
ব্যথা। অনেক সময় পায়খানার পরও বেশ কিছুক্ষণ জ্বালা বা পোড়া অনুভূত হয়।
কখনো কখনো পায়খানার সাথে বা টয়লেট পেপারে অল্প পরিমাণ টাটকা লাল রক্ত দেখা
যেতে পারে।
ব্যথাটা সাধারণত কাটার মতো বা ছুরি লাগার মতো মনে হয়। প্রাথমিক অবস্থায়
এনাল ফিশার বেশিরভাগ সময় ঠিক হয়ে যায়। এর জন্য আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া,
বেশি পানি পান করা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো খুব জরুরি। কুসুম গরম পানিতে
কিছুক্ষণ বসে থাকা আরাম দেয়। তবে যদি ব্যথা বা রক্তপাত দীর্ঘদিন চলতে থাকে,
তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। যদি দীর্ঘদিন ধরে পায়খানার সাথে রক্তপাত হয়, ব্যথা না কমে, ক্ষত সারে না বা হঠাৎ ওজন কমে যায়, তাহলে শুধু ফিসার ভেবে বসে না থেকে অবশ্যই ডাক্তার দেখানো উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ ফিসারের মতো মনে হতে পারে। সুতরাং বলা যায় এনাল ফিসার নিজে থেকে ক্যান্সারে পরিণত হয় না। তবুও দীর্ঘদিনের বা অস্বাভাবিক উপসর্গ অবহেলা না করে পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পায়খানার সময় হালকা রক্তপাত হতে পারে। এটি সাধারণত ক্ষত শুকানোর সময় হয় এবং কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। তবে রক্তপাত বেশি হলে অবশ্যই ডাক্তারকে জানাতে হয়। শুরুর দিকে পায়খানা আটকে থাকা বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। ব্যথার ভয়ে অনেকেই জোর দেন না। তাই পানি বেশি পান করা, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজনে স্টুল সফটনার নেওয়া খুব জরুরি।
কখনো কখনো অপারেশনের জায়গায় ইনফেকশন বা ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না রাখলে এই ঝুঁকি বাড়ে। জ্বর, অতিরিক্ত ব্যথা বা পুঁজ বের হলে দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে। খুব বিরল ক্ষেত্রে গ্যাস বা পায়খানা ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। সাধারণত এটি সাময়িক এবং পেশি শক্ত হলে ঠিক হয়ে যায়। তবে সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে ফলোআপ জরুরি।
উপরের উল্লেখিত মলম বা সাপোজিটরি সাধারণত এনাল ফিসার, পাইলস, পায়ুপথে জ্বালা বা চুলকানি এবং কিছু প্রদাহজনিত সমস্যার উপসর্গ কমাতে ব্যবহৃত হয়। এটি ব্যথা, জ্বালা, ফোলা বা অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে এবং রোগের আরামদায়ক অবস্থায় পৌঁছাতে সহায়ক হতে পারে।
এনাল ফিসার: মলদ্বারের চামড়ায় ছোট ফাটা বা ক্ষত। প্রধানত কোষ্ঠকাঠিন্য বা শক্ত পায়খানা দেওয়ার কারণে হয়।
পাইলস: মলদ্বারের ভেতরের বা বাইরের রক্তনালী ফুলে যাওয়া। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, গর্ভধারণ, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ওজন বেশি থাকলে হয়।
এনাল ফিসার: ব্যথা তীব্র, বিশেষ করে পায়খানার সময়। রক্তপাত সাধারণত অল্প এবং উজ্জ্বল লাল।
পাইলস: ব্যথা সব সময় নাও থাকতে পারে। রক্তপাত তুলনামূলক বেশি এবং অনেক সময় পায়খানার শেষ বা টয়লেট পেপারে দেখা যায়।
এনাল ফিসার: ফাটা সাধারণত সরাসরি মলদ্বারের ভেতরে বা মুখের কাছে থাকে। ক্ষত ছোট এবং তীক্ষ্ণ ব্যথা থাকে।
পাইলস: ভেতরের পাইলস দেখা যায় না, বাহ্যিক পাইলস আঙুলে ছোঁয়া গেলে নরম বা শক্ত গুটি মতো লাগে।
এনাল ফিসার: মল নরম রাখা, গরম পানিতে বসে থাকা, ব্যথানাশক বা পেশি শিথিলকারী মলম সাধারণত কার্যকর।
পাইলস: ব্যথা বা রক্তপাত কমাতে মলম, ওষুধ এবং কিছু ক্ষেত্রে ছোট সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায়, এনাল ফিসার হলো ক্ষত বা ফাটা, পাইলস হলো রক্তনালীর ফুলে যাওয়া। অনেক সময় উভয় সমস্যা একসাথে থাকতে পারে, তাই উপসর্গ অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
এনাল ফিসার কি ভালো হয়
হ্যাঁ, এনাল ফিসার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো হয়। বিশেষ করে যদি সমস্যা নতুন হয় এবং ঠিকভাবে যত্ন নেওয়া যায়, তাহলে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেরে যায়। শুরুর দিকের এনাল ফিসারকে অ্যাকিউট ফিসার বলা হয়। এই অবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, বেশি পানি পান করা, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া আর কুসুম গরম পানিতে বসে গোসল করলে অনেক সময় নিজে নিজেই ক্ষত শুকিয়ে যায়।
ডাক্তারের পরামর্শে মল নরম করার ওষুধ বা মলম ব্যবহার করলে আরাম দ্রুত
আসে। তবে যদি ফিসার দীর্ঘদিন থাকে, সাধারণত ৬ সপ্তাহের বেশি, তখন একে
ক্রনিক ফিসার বলা হয়। এই অবস্থায় শুধু খাবার বা ঘরোয়া যত্নে সব সময়
পুরোপুরি ভালো নাও হতে পারে। তখন নিয়মিত চিকিৎসা, বিশেষ মলম বা কিছু
ক্ষেত্রে ছোট চিকিৎসা পদ্ধতির দরকার হয়।
এনাল ফিসার থেকে কি ক্যান্সার হয়
এনাল ফিসার থেকে সাধারণত ক্যান্সার হয় না। এনাল ফিসার হলো মলদ্বারের চামড়ায় হওয়া একটি ফাটা বা ক্ষত। এটি সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত পায়খানা বা অতিরিক্ত চাপের কারণে হয় এবং সঠিক চিকিৎসা ও যত্ন নিলে ভালো হয়ে যায়। এই ধরনের ক্ষত থেকে ক্যান্সার হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। যদি দীর্ঘদিন ধরে পায়খানার সাথে রক্তপাত হয়, ব্যথা না কমে, ক্ষত সারে না বা হঠাৎ ওজন কমে যায়, তাহলে শুধু ফিসার ভেবে বসে না থেকে অবশ্যই ডাক্তার দেখানো উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ ফিসারের মতো মনে হতে পারে। সুতরাং বলা যায় এনাল ফিসার নিজে থেকে ক্যান্সারে পরিণত হয় না। তবুও দীর্ঘদিনের বা অস্বাভাবিক উপসর্গ অবহেলা না করে পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।
এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম
এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম সম্পর্কে আমাদের কাছে অনেকেই জানতে আগ্রহ পোষণ করেন। এনাল ফিসারের চিকিৎসায় সাধারণত ব্যথা কমানো, ক্ষত শুকানো আর পায়খানা নরম রাখা এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিচে প্রচলিত কিছু ওষুধের নাম ও ব্যবহার উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্যারা করে দিচ্ছি। এগুলো উদাহরণ হিসেবে জানাচ্ছি, নিজে নিজে শুরু করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
এনাল ফিসারের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় নাইট্রোগ্লিসারিন
অয়েন্টমেন্ট। এটি মলদ্বারের পেশি শিথিল করে, রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং
ক্ষত সারতে সাহায্য করে। ব্যবহার করলে অনেক সময় মাথা ঘোরা বা হালকা
মাথাব্যথা হতে পারে। আরেকটি বহুল ব্যবহৃত ওষুধ হলো ডাইলটিয়াজেম ক্রিম বা
নিফেডিপিন অয়েন্টমেন্ট।
এগুলোও পায়ুপথের পেশি ঢিলা করে ব্যথা কমায় এবং ফিসার দ্রুত ভালো হতে
সাহায্য করে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম। ব্যথা ও জ্বালা কমানোর
জন্য অনেক সময় লিডোকেইন জেল বা অয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয়। এটি সাময়িক
আরাম দেয়, তবে একা একে চিকিৎসা হিসেবে ধরা হয় না।
পায়খানা নরম রাখার জন্য ল্যাকটুলোজ সিরাপ, ইসবগুলের ভুষি, বা অন্য কোনো
স্টুল সফটনার দেওয়া হয়। এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শক্ত পায়খানা
চলতে থাকলে ফিসার ভালো হয় না। কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ বা অতিরিক্ত
জ্বালার জন্য ডাক্তার কম্বিনেশন মলম দেন, যেখানে ব্যথানাশক ও
অ্যান্টিসেপটিক উপাদান থাকে।
এনাল ফিসার থেকে মুক্তির উপায়
এনাল ফিসার থেকে মুক্তি পেতে হলে একসাথে কিছু অভ্যাস, খাবার আর চিকিৎসা ঠিক রাখতে হয়। ঠিকভাবে করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপারেশন ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং খাবারে আঁশ রাখতে হবে। শাকসবজি, ফল, ইসবগুলের ভুষি এসব নিয়মিত খেলে পায়খানা নরম থাকে, চাপ কমে এবং ক্ষত সেরে উঠতে পারে।
পায়খানার সময় কখনোই জোর দেওয়া যাবে না। বেশি সময় টয়লেটে বসে থাকা
ঠিক না। পায়খানা এলে দেরি না করে যাওয়া ভালো, এতে পায়ুপথের ওপর চাপ কম
পড়ে। প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট কুসুম গরম পানিতে বসে গোসল করলে ব্যথা ও
জ্বালা অনেকটাই কমে। এটি পায়ুপথের পেশি শিথিল করে এবং ক্ষত শুকাতে
সাহায্য করে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নাইট্রোগ্লিসারিন, ডাইলটিয়াজেম
বা নিফেডিপিন জাতীয় মলম ব্যবহার করলে বেশিরভাগ এনাল ফিসার সেরে যায়।
ব্যথা বেশি হলে অল্প সময়ের জন্য লিডোকেইন জেল ব্যবহার করা যায়।
খাবারের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঝাল, খুব মসলা, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া আপাতত কম খাওয়াই ভালো। বেশি তেল-মশলা পায়খানার সময় জ্বালা বাড়াতে পারে। যদি ৪–৬ সপ্তাহেও ব্যথা বা রক্তপাত না কমে, বারবার ফিসার ফিরে আসে, বা ব্যথা অসহনীয় হয়, তাহলে অবশ্যই সার্জন বা গ্যাস্ট্রো বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োজন হয়। নিয়মিত যত্ন, সঠিক খাবার আর ধৈর্যই এনাল ফিসার থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
খাবারের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঝাল, খুব মসলা, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া আপাতত কম খাওয়াই ভালো। বেশি তেল-মশলা পায়খানার সময় জ্বালা বাড়াতে পারে। যদি ৪–৬ সপ্তাহেও ব্যথা বা রক্তপাত না কমে, বারবার ফিসার ফিরে আসে, বা ব্যথা অসহনীয় হয়, তাহলে অবশ্যই সার্জন বা গ্যাস্ট্রো বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োজন হয়। নিয়মিত যত্ন, সঠিক খাবার আর ধৈর্যই এনাল ফিসার থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এনাল ফিসার থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়
উপরে আমরা এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম বিষয়ে আলোচনা করেছি এবার আমরা এনাল ফিসার থেকে মুক্তির জন্য কিছু সহজ ও নিরাপদ ঘরোয়া উপায় আছে। শুরুর দিকের ফিসারে এগুলো ঠিকভাবে মানলে অনেক সময় ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পায়খানা নরম রাখা। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। সকালে খালি পেটে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি খেলে অনেকেরই পায়খানা সহজ হয়।
খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল আর আঁশযুক্ত খাবার রাখুন। ইসবগুলের ভুষি খুব
কার্যকর একটি ঘরোয়া উপায়। রাতে ঘুমানোর আগে ১–২ চা চামচ ইসবগুল কুসুম
গরম পানি বা দইয়ের সাথে খেলে পায়খানা নরম থাকে এবং ফিসারে চাপ কমে।
প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট কুসুম গরম পানিতে বসে থাকা খুব উপকারী।
সকালে বা পায়খানার পর এটি করলে ব্যথা, জ্বালা আর পেশির টান অনেকটাই কমে
যায়। খাবারের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ঝাল, অতিরিক্ত মসলা, ভাজাপোড়া
আপাতত কম খাওয়াই ভালো। সাদা ভাতের সাথে সবজি, স্যুপ, ফল এসব হালকা খাবার
ফিসার ভালো হতে সাহায্য করে। পায়খানার সময় কখনোই জোর দেবেন না এবং বেশি
সময় টয়লেটে বসে থাকবেন না।
পায়খানার বেগ এলে দেরি না করে যান। টয়লেট ব্যবহারের পর শক্ত টিস্যু না
ব্যবহার করে পানি দিয়ে পরিষ্কার করলে জ্বালা কম হয়। এই ঘরোয়া
নিয়মগুলো নিয়মিত মানলেও যদি ২–৩ সপ্তাহে উন্নতি না হয়, রক্তপাত বাড়ে
বা ব্যথা অসহনীয় হয়ে যায়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া
দরকার।
এনাল ফিসার এর লক্ষণ
এনাল ফিসারের লক্ষণগুলো সাধারণত স্পষ্ট হয় এবং পায়খানার সময়ই বেশি বোঝা যায়। নিচে সহজভাবে প্যারা করে দিচ্ছি। এনাল ফিসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো পায়খানার সময় তীব্র ব্যথা। অনেকের কাছে এই ব্যথা কাটার মতো বা ছুরি লাগার মতো মনে হয় এবং পায়খানা শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ ব্যথা থাকতে পারে। পায়খানার সাথে বা টয়লেট পেপারে অল্প পরিমাণ টাটকা লাল রক্ত দেখা যেতে পারে।
সাধারণত রক্তের পরিমাণ কম হয়, কিন্তু রঙ উজ্জ্বল লাল হয়। পায়খানার পর
মলদ্বারের আশপাশে জ্বালা, পোড়া ভাব বা অস্বস্তি অনুভূত হয়। কিছু
ক্ষেত্রে এই জ্বালা দীর্ঘ সময় থাকতে পারে। অনেক সময় পায়খানার ভয়ে
মানুষ টয়লেটে যেতে চায় না। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য বেড়ে যায় এবং ফিসারের
সমস্যা আরও খারাপ হয়। দীর্ঘদিনের ফিসারে মলদ্বারের পাশে ছোট শক্ত
চামড়ার টুকরা বা গুটি মতো দেখা যেতে পারে এবং ক্ষত শুকাতে দেরি হয়।
এনাল ফিসার অপারেশন পরবর্তী সমস্যা
এনাল ফিসারের অপারেশন সাধারণত নিরাপদ এবং সফল হয়। তবুও অপারেশনের পর কিছু সাময়িক সমস্যা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগই সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যায়। অপারেশনের পর প্রথম কয়েকদিন হালকা থেকে মাঝারি ব্যথা থাকতে পারে। বিশেষ করে পায়খানার সময় অস্বস্তি হয়। ডাক্তার দেওয়া ব্যথানাশক ও গরম পানিতে বসে থাকলে ধীরে ধীরে কমে যায়।কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পায়খানার সময় হালকা রক্তপাত হতে পারে। এটি সাধারণত ক্ষত শুকানোর সময় হয় এবং কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। তবে রক্তপাত বেশি হলে অবশ্যই ডাক্তারকে জানাতে হয়। শুরুর দিকে পায়খানা আটকে থাকা বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। ব্যথার ভয়ে অনেকেই জোর দেন না। তাই পানি বেশি পান করা, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজনে স্টুল সফটনার নেওয়া খুব জরুরি।
কখনো কখনো অপারেশনের জায়গায় ইনফেকশন বা ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না রাখলে এই ঝুঁকি বাড়ে। জ্বর, অতিরিক্ত ব্যথা বা পুঁজ বের হলে দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে। খুব বিরল ক্ষেত্রে গ্যাস বা পায়খানা ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। সাধারণত এটি সাময়িক এবং পেশি শক্ত হলে ঠিক হয়ে যায়। তবে সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে ফলোআপ জরুরি।
এনাল ফিসার এর ঔষধ মলম
এনাল ফিসারের ক্ষেত্রে সাধারণত মলম বা জেল ব্যবহার করা হয় যাতে ব্যথা কমে, পেশি শিথিল হয় এবং ক্ষত দ্রুত ভালো হয়। নিচে সবচেয়ে প্রচলিত কিছু মলমের নাম ও ব্যবহার সংক্ষেপে দেয়া হলো। এগুলো ডাক্তার দেখানোর পরে ব্যবহার করাই নিরাপদ।নাইট্রোগ্লিসারিন মলম (Nitroglycerin ointment)
- মলদ্বারের পেশি শিথিল করে।
- রক্ত চলাচল বাড়ায়, ক্ষত দ্রুত সারতে সাহায্য করে।
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: হালকা মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা হতে পারে।
ডাইলটিয়াজেম বা নিফেডিপিন মলম (Diltiazem বা Nifedipine ointment)
- পায়ুপথের পেশি ঢিলা করে।
- ব্যথা কমাতে এবং ফিসার দ্রুত সারাতে সাহায্য করে।
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত কম।
লিডোকেইন জেল (Lidocaine gel)
- সাময়িক ব্যথা ও জ্বালা কমাতে ব্যবহৃত হয়।
- একা এই জেল দিয়ে ফিসার সারানো যায় না, শুধু আরাম দেয়।
কম্বিনেশন মলম
- ব্যথানাশক ও অ্যান্টিসেপটিক উপাদান থাকে।
- সংক্রমণ প্রতিরোধে ও আরাম দিতে ব্যবহার হয়।
এনাল ফিসার এর এন্টিবায়োটিক
এনাল ফিসারের ক্ষেত্রে সাধারণত সরাসরি সব ফিসারে এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না, কারণ এটি মূলত ফাটা বা ক্ষত, সংক্রমণ নয়। তবে যদি ফিসারের সঙ্গে সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয় যেমন পুঁজ, ফোলা, লাল ভাব বা জ্বর তাহলে ডাক্তার এন্টিবায়োটিক প্রিসক্রাইব করতে পারেন। সাধারণত ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিকের নাম নিচে দেওয়া হল- অ্যামোক্সিসিলিন (Amoxicillin)
- সিপ্রোফ্লক্সাসিন (Ciprofloxacin)
- মেট্রোনিডাজোল (Metronidazole)
এরিয়ান সাপোজিটরি এর কাজ কি
Erian Suppository হলো একটি মলদ্বারের সাপোজিটরি যা এনাল ফিসার, পাইলস (হেমরয়েড), জ্বালা, ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত হয়। এতে চারটি উপাদান থাকে এবং প্রত্যেকটি আলাদা কাজে লাগে:- Cinchocaine এটা একটি স্থানীয় ব্যথানাশক। মলদ্বারের পেশিতে ব্যথা ও অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।
- Hydrocortisone এটা একটি স্টেরয়েড, যা প্রদাহ, লাল ভাব ও জ্বালা কমাতে সহায়তা করে।
- Framycetin এটা একটা অ্যান্টিবায়োটিক, যা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
- Esculin প্রদাহ কমাতে এবং নিরাময় প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে ব্যবহৃত হয়।
উপরের উল্লেখিত মলম বা সাপোজিটরি সাধারণত এনাল ফিসার, পাইলস, পায়ুপথে জ্বালা বা চুলকানি এবং কিছু প্রদাহজনিত সমস্যার উপসর্গ কমাতে ব্যবহৃত হয়। এটি ব্যথা, জ্বালা, ফোলা বা অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে এবং রোগের আরামদায়ক অবস্থায় পৌঁছাতে সহায়ক হতে পারে।
ব্যবহার , সতর্কতা ও সাবধানতা
- ডাক্তার নির্দিষ্ট ডোজ ও সময় অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।
- দীর্ঘ সময় বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
- যদি ১–২ সপ্তাহে উন্নতি না হয় বা উপসর্গ বাড়ে, তাহলে ডাক্তারকে দেখানো দরকার।
এনাল ফিসার ও পাইলস এর পার্থক্য সমূহঃ
এনাল ফিসার ও পাইলস (হেমরয়েড) দুইটাই মলদ্বারের সমস্যা, কিন্তু কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসার দিক থেকে তারা আলাদা। নিচে সহজভাবে পার্থক্য দেখানো হলো।এনাল ফিসার: মলদ্বারের চামড়ায় ছোট ফাটা বা ক্ষত। প্রধানত কোষ্ঠকাঠিন্য বা শক্ত পায়খানা দেওয়ার কারণে হয়।
পাইলস: মলদ্বারের ভেতরের বা বাইরের রক্তনালী ফুলে যাওয়া। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, গর্ভধারণ, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ওজন বেশি থাকলে হয়।
এনাল ফিসার: ব্যথা তীব্র, বিশেষ করে পায়খানার সময়। রক্তপাত সাধারণত অল্প এবং উজ্জ্বল লাল।
পাইলস: ব্যথা সব সময় নাও থাকতে পারে। রক্তপাত তুলনামূলক বেশি এবং অনেক সময় পায়খানার শেষ বা টয়লেট পেপারে দেখা যায়।
এনাল ফিসার: ফাটা সাধারণত সরাসরি মলদ্বারের ভেতরে বা মুখের কাছে থাকে। ক্ষত ছোট এবং তীক্ষ্ণ ব্যথা থাকে।
পাইলস: ভেতরের পাইলস দেখা যায় না, বাহ্যিক পাইলস আঙুলে ছোঁয়া গেলে নরম বা শক্ত গুটি মতো লাগে।
এনাল ফিসার: মল নরম রাখা, গরম পানিতে বসে থাকা, ব্যথানাশক বা পেশি শিথিলকারী মলম সাধারণত কার্যকর।
পাইলস: ব্যথা বা রক্তপাত কমাতে মলম, ওষুধ এবং কিছু ক্ষেত্রে ছোট সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায়, এনাল ফিসার হলো ক্ষত বা ফাটা, পাইলস হলো রক্তনালীর ফুলে যাওয়া। অনেক সময় উভয় সমস্যা একসাথে থাকতে পারে, তাই উপসর্গ অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
এরিয়ান মলম এর কাজ কি
এরিয়ান মলম হলো মলদ্বারের ক্ষত, ফোলা বা ব্যথা কমানোর জন্য ব্যবহৃত একটি কম্বিনেশন মলম। এটি মূলত পাইলস ও এনাল ফিসারের উপসর্গ কমাতে ব্যবহৃত হয়। এর কাজগুলো হলো:- এরিয়ান মলমে থাকা স্থানীয় ব্যথানাশক উপাদান (যেমন সিনকোকেইন) পায়ুপথের পেশি শিথিল করে এবং পায়খানার সময় ব্যথা হ্রাস করে।এতে থাকা হাইড্রোকর্টিসোন স্টেরয়েড প্রদাহ, লাল ভাব ও জ্বালা কমাতে সাহায্য করে।
- এতে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক (ফ্রামাইসেটিন) ক্ষত সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
- স্কুলিনের মতো উপাদান ক্ষত শুকাতে ও ত্বকের স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
- এরিয়ান মলম ব্যথা, জ্বালা, ফোলা ও সংক্রমণ কমায় এবং ক্ষত নিরাময়কে সহায়তা করে।
এনাল ফিসার সম্পর্কিত সকল প্রশ্ন সমূহঃ
মেডিকেল ফিশার কি
মলদ্বারের বাইরের অংশ ও আস্তরণে একটি ছোট ফাটলকে মেডিকেলের ভাষায় অ্যানাল ফিসার বা ফিশার ইন অ্যানো বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও অনেক ভারতীয় চিকিৎসকরা একে ফিশার ডিজিজ ও বলে থাকে।
এনাল ফিসার কত দিনে ভালো হয়?
এনাল ফিসার কত দিনে ভালো হবে তা নির্ভর করে আপনার কোন ধরনের এনাল ফিসার হয়েছে তার ওপর তবে সাধারণত নতুন এনাল ফিসার ঠিক হতে ২ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় থাকতে পারে ও পুরাতন এনাল ফিসানের ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় থাকতে পারে।এনাল ফিসার অপারেশনের খরচ কত?
এনাল ফিসার অপারেশন করতে কত খরচ লাগতে পারে তা নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের
হাসপাতালে বা চিকিৎসার কাছ থেকে অপারেশন করতে চান তার উপর। তবে সাধারন ভাবে
বলতে গেলে হাসপাতাল ভেদে ১৫ হাজার থেকে এক লাখ বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত
লাগতে পারে।
ফিসার সার্জারি কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, ভালো চিকিৎসা কার কাছ থেকে সার্জারি করালে অবশ্যই ফিশার সার্জারি নিরাপদ।অপারেশনের পর কি ফিশার ফিরে আসতে পারে?
হ্যাঁ, অপারেশনের পর আবার এই রোগ ফিরে আসতে পারে তবে এই রোগ ফিরে আসা সম্ভব না নেই বললেই চলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপারেশনের পরে এই রোগ আর ফিরে আসে না।অপারেশন ছাড়া কি ফিসার সারানো যায়?
হ্যাঁ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়া এ রোগ ভালো হয়ে যায় আর কিছু শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই রোগ আবার ফিরে আসতে পারে।বাচ্চাদের ফিশারের চিকিৎসা?
বাচ্চাদের এই ধরনের সমস্যা হলে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়াতে হবে , প্রচুর পরিমাণে ফাইবার যুক্ত খাবার খাওয়ানো, মল সফটনার গ্রহণ করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ক্ষত স্থানটি পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে , আক্রান্ত স্থানে নিয়ম মেনে মলম লাগালে ব্যথা অনেকটাই উপশম হয় ও রোগ দ্রুত নিরাময় হয়।গর্ভাবস্থায় ফিশারের চিকিৎসা?
গর্ভাবস্থায় এই সমস্যার চিকিৎসার জন্য সিটজ বাথ একটি খুবই সহজ ও কার্যকর উপায় হিসেবে পরিচিত। সিটজ বাথের চিকিৎসার সময় দিনে কয়েকবার মলদ্বার স্থানটিতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। কেননা এর ফলে আক্রান্তি স্থানে রক্ত প্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধি পাবেও ক্ষতটি দ্রুত শুকিয়ে যাবে।উপসংহারঃএনাল ফিসার এর ঔষধ নাম, লক্ষণ, কারণ, ঘরোয়া চিকিৎসা ও প্রতিকার
উপরে আমরা এনাল ফিসার এর ঔষধ নাম, এই রোগের লক্ষণ লক্ষণ, কোন কারণে এই
রোগে হয়ে থাকে এই রোগ নিরাময়ের ঘরোয়া চিকিৎসা ও প্রতিকার সম্পর্কে
বিস্তারিত আলোচনা করেছে। যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পেরেছি অ্যানাল ফিসার রোগটি
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য একটি খুবই বিরক্তিকর সমস্যা।
তবে এই রোগ হলে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এছাড়াও বাংলাদেশের বাজারে এনাল ফিসার সমস্যা দূর করার জন্য বিভিন্ন ধরনের
ওষুধ ও মলম পাওয়া যেয়ে থাকে। এছাড়া আপনি চাইলে অপারেশনের মাধ্যমে এই রোগ
থেকে মুক্তি পেতে পারেন । আশা করা যায় এই পোষ্টের মাধ্যমে আপনি উপকৃত
হয়েছেন ধন্যবাদ।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url